ধারাবাহিক উপন্যাস: বন্ধুবিলাস (পর্ব-৭)

Date | 2015-01-28 | 00:27:26

অনেকক্ষণ ধরে চৌধুরীকে লক্ষ্য করলো কাসু। কোন কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস হচ্ছে না তার। তবে এটুকু আন্দাজ করতে পারছে- চৌধুরীর মন খুব খারাপ আজ। যতদিন ধরে তার বাড়িতে আছে কোনদিন তাকে কাঁদতে দেখে নি সে। কবরস্থানে আজ হু হু করে কেঁদেছেন চৌধুরী। তার বিক্ষিপ্ত মনকে হালকা করতে এটা-সেটা আলাপ জমাতে চেষ্টা করে কাসু। কোন জমির ফসল কেমন হয়েছে। ফলন কেমন হবে। কোন জমিতে সার দেয়া দরকার, নিড়ানি দেয়া দরকার এসব নিয়ে টুকটাক কথা বলছে। হু হা জবাব দিচ্ছেন চৌধুরী। এর ফাঁকে এক সময় কাসু বলে- এত্ত বড় বাড়ি। মাত্র চার-পাঁচজন লোক। এক্কেবারে খালি খালি লাগে। চৈত্র মাসের ভর দুপুরের মতো খা খা করে। ঘরের লক্ষ্মী না থাকলে যা হয়। একটা বউ আনতে পারলে ভাল হয় না হুজুর?
কাসুর কথা শুনে চমকিত চৌধুরী। তাই তো- কাসু তো মন্দ বলে নি। তাছাড়া স্বপ্নটা দেখার পর থেকে তার মনে হচ্ছে- তিনি আর বেশি দিন বাঁচবেন না। তার বাবা সুস্থ মানুষ ছিলেন। স্বর্দি জ্বর হয়েছে বলেও মনে করতে পারেন না। অথচ হঠাৎ করে মারা গেছেন। স্পষ্ট মনে আছে- সারাদিন মাঠে কাজকর্ম তদারক করেছেন। বিকালে গ্রামে একটা সালিশ বৈঠক করে ঘরে ফিরে নিজ হাতে গরম পানি করেছেন। অজু করে মাগরেব নামাজ আদায় করেছেন। গরম ভাজা ইলিশ মাছ খুব পছন্দ করতেন তিনি। মাকে বলেন মাছ ভেজে দিতে। ওই মাছ দিয়ে পেট পুরে ভাত খান বাবা। বিছানায় শুয়ে তজবিহ জপছিলেন। হঠাৎ জাফর চৌধুরীকে ডেকে পাঠান। কাছে বসিয়ে কোথায় কি আছে, তাদের কত জমিজমা আছে, ওগুলো কিভাবে দেখাশুনা করতে হবে বুঝিয়ে বলেন। সবশেষে বলেনÑ আমাকে একটু ধরো। শরীরে বল পাচ্ছি না। কেমন নিস্তেজ হয়ে আসছে সব। এশার সময় হয়েছে কিনা জানতে চান। জাফর চৌধুরী বলেনÑ কিছুক্ষণ আগে আজান হয়েছে। এবার তিনি বলেন- আমাকে পশ্চিম মুখো করে দাও। আমি নড়তে পারছি না। বাবাকে ধরে পশ্চিমমুখী করে দিলে তিনি ইশারায় অজু করেন। এরপর নামাজে বসেন। প্রথম রুকু ও সেজদার পর তিনি কাঁপছিলেন। তার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। দ্বিতীয় সেজদায় গিয়ে আর উঠতে পারেননি। ওখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন।
জীবনে বহু লোকের মৃত্যু দেখেছেন চৌধুরী। মৃত্যুর চেয়ে নির্মম ও মর্মন্তুদ আর কিছু নেই পৃথিবীতে। তবে পিতার মৃত্যু তার কাছে খুব সুখের মনে হয়। এমন সৌভাগ্য ক’জনের হয়!

রোদের তীব্রতা ক্রমশ বাড়ছে। তবে বাতাস বইছে বিধায় তেমন গরম লাগছে না।
চাষী বধূরা এক হাতে সানকিতে পান্তা নিয়ে গামছা দিয়ে বেঁধে আর অন্য হাতে পানির জগ নিয়ে জমিতে এসে হাজির। চাষীরা লাঙল তুলে ক্ষেতের আইলে পিয়াজ, কাঁচা মরিচ আর লবণ দিয়ে পান্তা খেতে বসছে। ধুলো ময়লায় মাখা হাত ধোয়ারও প্রয়োজন মনে করছে না। পরনের লুঙ্গিতে হাত মুছে পরম তৃপ্তিতে শুরু করছে খাওয়া। দেখে মনে হচ্ছে যেন বেহেশতের মেওয়া খাচ্ছে। পৃথিবীতে এর চেয়ে মজাদার খাবার আর কিছু নেই। খাওয়া শেষ করে কেউ কেউ বিড়ি ফুঁকছে।
ওখান থেকেই চৌধুরীকে সালাম দিচ্ছে। সালামের উত্তর দিলেও চৌধুরীর সেদিকে মন নেই। তিনি মনে মনে ভাবছেন- ঘটককে খবর দেয়া দরকার। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। ঘরে একটা লক্ষ্মীর ব্যবস্থা করতে পারলে খুব ভাল হয়। এসব নানা সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে এগোচ্ছেন তিনি। উল্টোদিক থেকে হেঁটে আসছে হরমুজ। মুখোমুখি হলে চৌধুরীকে সালাম দেয় সে।
আরে হরমুজ মিয়া নাকি? তোমার কথাই ভাবছিলাম। কই যাও?
আপনার বাড়ির দিকেই যাইতাছিলাম।
আমার বাড়ির দিকে। তা কি মনে করে?
একটা কথা ছিল।
ঠিক আছে চলো। শুনি তুমি কি বলতে চাও। আমিও মনে মনে তোমাকে খুঁজছিলাম।

কথা বলতে বলতে বাড়িতে এসে ঢোকে তারা। বৈঠকখানায় বসে চৌধুরী জানতে চান-
এবার বলো আমার কাছে কি মনে করে?
আমার তো কাম একটাই চৌধুরী সাব। দুই হাত আর দুই পক্ষ এক করা।
আরে আমিও তো এইজন্যই তোমারে খুঁজছিলাম। বাড়িটা এক্কেবারে খালি খালি লাগে। বউঝিরা হইলো বাড়ির লক্ষ্মী। তাছাড়া ক’দিন ধইরা শরীরটাও ভাল যাচ্ছে না। মরার আগে ঘরে একটা বউ আনতে পারলে কবরে গিয়াও শান্তি পাব। এইবার বলো পাত্রী কে? কার মেয়ে?
চলবে
লেখক : দুলাল হাসান